অতুল যাত্রা অতুল প্রসাদ সেনের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে

মাহ্দী হাসান খান
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  09:27 PM, 20 October 2021

অতুলপ্রসাদ সেনের (১৮৭১-১৯৩৪) জন্ম হয়েছিল ঢাকায় লক্ষীবাজারের নানা বাড়ীতে ১৮৭১খৃষ্টাব্দের ২০অক্টোবর । তার পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পঞ্চপল্লী গ্রামে। মিডল টেম্পল থেকে বার-এট-ল সম্পন্ন করে যখন দেশে ফিরলেন,আইন পেশার শুরুর দিনগুলােতে আর দশ জনের মত তারও নানা অনিশ্চয়তা ছিল। উপার্জন ছিল অপ্রতুল। শুরু করেছিলেন কলকাতায় কিন্তু ভাল পসার হয়নি, ফলে ভাবলেন রংপুরে মফস্বলে চলে যাবেন। সেখানেও খুব উন্নতি করতে পারলেন না। সাফল্যের অন্বেষনে তিনি তখন লক্ষ্ণৌতে পাড়ি জমালেন । ললিতকলা চর্চায় লক্ষৌ তখন একটি সমৃদ্ধ শহর । সেখানে তিনি একটা পরিসর পান, যা সংগীত চর্চাকে আরও উৎসাহিত করে। তিনি গজল লিখেন,মােশায়েরায় যােগ দেন এবং উর্দু ভাষাটি রপ্ত করে নেন।

লক্ষ্ণৌ হাইকোর্টে আইনজীবি হিসাবে যােগদেন ১৯০২ সনে । গজল,মােশায়েরা আর শুদ্ধ সংগীতের পাদপীঠ লক্ষৌ তাকে পেশাগত জীবনে যেমন সাফল্য এনে দিল তেমনি তার সংগীত চর্চাও অব্যহত থাকলাে । হাইকোর্টে সফল আইনজীবি হিসাবে যেমনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তেমনি রাজনীতিতেও তিনি লক্ষৌর নাগরিকদের ভালবাসা পান। লক্ষৌ মিউনিসিপল বাের্ডের নির্বাচনে বিপুল ভােটে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনীতিক,সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষানুরাগী হিসাবে ছিলেন সমাদৃত । যদিও তিনি আমাদের গান দিয়ে চেনা অতুল প্রসাদ সেন। আদালতের কাছে অসাধারণ আরজি ও জবাব লিখতেন যে ব্যারিস্টার এ পি সেন, সেই ব্যারিস্টার এ পি সেনই আবার লিখেছিলেন :

“মােদের গরব মােদের আশা,
আ মরি বংলা ভাষা!
কী যাদু বাংলা গানে…”

বাংলা গানে তিনিও যুক্ত করেছিলেন নতুন নতুন “যাদু” । জীবনের বিবিধ ভাব তার সংগীতে উঠে এসেছে । দেবতা, প্রকৃতি,স্বদেশ, মানব ও বিবিধ প্রসঙ্গে তার গান বাঙালীর জীবনে মিশে গেছে। তার রচনা সম্ভারে রয়েছে ২০৮ টি চারটি প্রবন্ধ ও কয়েকটি কবিতা। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- “সংগীতে এতখানি প্রাণ থাকা চাই, যাহাতে সে সমাজের বয়সের সহিত বাড়িতে থাকে, সমাজের পরিবর্তনের সহিত পরিবর্তিত হতে থাকে, সমাজের উপর নিজের প্রভাব বিস্তৃত করিতে পারে ও তাহার উপর সমাজের প্রভাব প্রযুক্ত হয়। জীবনের নানা সংকটে তিনি শরণ নিয়েছেন গানের । সেসব গান কখনাে স্বগতােক্তি, কখনাে সম্বােধন হয়ে এসেছে। অতুলপ্রসাদের আধ্যাত্মিকতা ও তার পারিবারিক জীবনে টানাপােড়েন, এসবই তাকে আরও বেশি করে সৃজনপ্রবন করেছে বলে তার জীবনিকাররা মনে করেন। তার রচনায় সমাজ ভাবনা উচ্চকিত হয়েছে এবং সমাজও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। তার রচনায় পাই

“ দেখ মা, এবার দোয়ার খুলি।
গলে গলে এনু মা , তাের।
হিন্দু-মুসলমান-দু ছেলে।”

রবীন্দ্রনাথের “খামখেয়ালী সভা” এর কনিষ্ঠতম এ সদস্য সমকালীন শিল্পী সাহিত্যিক রাজনীতিকদের নিবিড় সাহচর্য পেয়েছেন। মহাত্মা গান্ধী ছিলেন তার একজন তৃপ্ত শ্রোতা । বাংলা গানের এ অমর স্রষ্টাকে ভালবেসে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩২ সালে তার পরিশেষ কাব্যটি আর্শীবাদের সাথে উৎসর্গ করেছিলেন। উৎসর্গের পত্রে রবীন্দ্রনাথ লেখেন :

বঙ্গের দিগন্ত ছেয়ে বাণীর বাদল
বহে যায় শতস্রোতে রস- বন্যা-বেগে;
কভু বজ্ৰবহ্নি কভু সিগ্ধ অশ্রুজল
ধ্বনিছে সঙ্গীতে ছন্দে তারি পুঞ্জমেঘে;
বঙ্কিম শশাঙ্ককলা তারি মেঘ-জটা
চুম্বিয়া মঙ্গলমন্ত্রে রচে স্তরে স্তরে –
সুন্দরের ইন্দ্রজাল; কত রশ্মিচ্ছটা
প্রত্যুষে দিনের অন্তে রাখে তারি পরে!
আলােকের স্পর্শমণি, আজি পূর্ব বায়ে
বঙ্গের অম্বর হতে দিকে দিগন্তরে
সহর্ষ বর্ষণধারা গিয়েছে ছড়ায়ে
প্রাণের আনন্দবেগে পশ্চিমে উত্তরে;
দিল বঙ্গবীণাপাণি অতুল প্রসাদ।
তব জাগরণী গানে নিত্য আর্শীবাদ

অতুলপ্রসাদ সেনের জীবনিকার বিশ্বজিৎ ঘােষের মূল্যায়নটি প্রনিধানযােগ্য “ মানবচৈতন্যের অন্তরবাস্তবতার নান্দীপাঠে এবং সদর্থক জীবনবােধের ঔজ্জ্বল্যে তাঁর গান ও কবিতা প্রবহমান বাংলা সংস্কৃতির ধারায় সংযােজন করেছে একটি বিশিষ্ট মাত্রা।”

কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ গ্রামে, যেখানে অতুল প্রসাদ সেনের সমাধিটি রয়েছে। কাওরাইদ রেলস্টেশনের কারণে এ জায়গাটি অনেক আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ব্রাহ্মসমাজের সমাধি ক্ষেত্রটি সংরক্ষণ ও পাশে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তােলা যেতে পারে। শিল্প সংস্কৃতির চর্চার পাশাপাশি সমাজের যে অনগ্রসরতা আমাদের পীড়িত করে তার কথা অতুলপ্রসাদ সেন আমাদের বলেছিলেন -“ এ আঁধার ঘুচাতে হবে, নইলে এদেশ এমনি রবে”। সে আঁধার ঘুচাতে এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অবদান রাখবে। অতুল প্রসাদের স্মৃতি বিজরিত কাওরাইদ থেকে শুরু হবে আরেক অতুলযাত্রা। আজ অতুলপ্রসাদ সেনের সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করছি।

আপনার মতামত লিখুন :