অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের কর্মস্বীকৃতি রাষ্ট্র দেবে না?

ড.নাদিম মাহমুদ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৪:৩৬ PM, ১৩ মার্চ ২০২১

বছর পাঁচেক আগে কবি নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকে ‘আমাকে স্বাধীনতা পদক দিন’ শিরোনামে এক পোস্ট দিয়েছিলেন। সেই পোস্ট দেখার পর অনেকর মতো আমিও কিছুটা লজ্জিত হয়েছিলাম। ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ সহ অনেক কবিতার জন্মদাতা দেশের অন্যতম এই কবিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না দেওয়া আমাদের জন্য দায় হয়ে উঠলেও রাষ্ট্র তা বুঝতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত লোক-লজ্জার কথা ভুলে গিয়ে নিজের প্রাপ্য সম্মানের জন্য নিজেই তিনি পুরস্কার চেয়েছিলেন। ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদক ঘোষণার দুই সপ্তাহ পর এই কবিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। লজ্জার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল রাষ্ট্র।

কবি নির্মলেন্দু গুণ নিজ কর্মগুণে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। বেলা পড়ার সময় তিনি এই পুরস্কার না পেলেও হয়তো একদিন তার শারীরিক অনুপস্থিতিতে নাম ঘোষণা করতে হতো রাষ্ট্রকে। সেই পুরস্কারে কবি নির্মলেন্দু গুণের নামের আগে বসতো ‘মরণোত্তর’। সেটাই হতো আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতা। জীবিত অবস্থায় আমাদের গুণীদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারি না বলেই হয়তো মরণোত্তর সম্মাননা প্রতি বছর দেওয়া হচ্ছে। এই দেশের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার অনেককেই দেওয়া হয়েছে ‘সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি’ মারা যাওয়ার পর। ঠিক কী কারণে আমরা এই মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই, তার কারণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা বুঝতে না পারলে এই দেশের পুরস্কার-সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিরা ভালো বলতে পারবেন।
কবি নির্মলেন্দু গুণ যে সাহস দেখিয়েছিলেন, সেই সাহস দেখানোর ক্ষমতা সবার থাকে না। খ্যাতিমান অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। জীবিত অবস্থায় তো নয়, মরার এক দশক পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পুরস্কার অপ্রাপ্তি নিয়ে আলোচনার পর চোখ খুলে যায় আমাদের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের। আজকে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করে দেব, সেই ব্যক্তিকে হয়তো অনেকেই আপনারা চেনেন, জানেন। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের দৃষ্টিসীমা সেই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক নন, আমার কোনো আত্মীয় নন। তিনি কেবল একজন আদর্শিক গবেষক, বিজ্ঞানী ও প্রতিভাবান শিক্ষক। এমন নির্লোভ ব্যক্তিকে আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে পরিচয় করে দেওয়া নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করছি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক। পদার্থবিজ্ঞানে দেশের একমাত্র ইমেরিটাস অধ্যাপক তিনি। আশি-ঊর্ধ্ব এই অধ্যাপক নিজেকে মেলে ধরেছেন জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে। গবেষণায় মত্ত এমন বিজ্ঞানী দেশে খুব কম আছেন। নানাগুণে গুণান্বিত অধ্যাপক বসাকের জ্ঞান বিতরণের সম্মাননা আমাদের রাষ্ট্র এখনও দিতে পারেনি। প্রতি বছর একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গবেষক, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীদের দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাককে চিনতে না পারা সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের চরম ব্যর্থতা, অপমানের। সঠিক সময়ে সঠিকজনকে মূল্যায়ন করতে না পারলে এইসব গুণীর কিছু আসে যায় না, কিন্তু জাতি হিসেবে তাদের সৃষ্টিকর্মকে ব্যবহার করতে না পারায় হয়তো লোকসান হচ্ছে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
কয়েক মাস আগে মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আলোকবর্তিকার সঙ্গে। অধ্যাপনা থেকে অবসর নিলেও কেবল গবেষণার টানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিজ্ঞান ভবনের নিচতলার পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রায় প্রতিদিনই আসেন। গবেষণা করেন, ছাত্রদের শেখান। নিজের বেতনের সিংহভাগই দান করেন এই অধ্যাপক। তার বিলেতে গিয়ে গবেষণা করে উপার্জন করার পথ থাকলেও কেবল মাতৃভূমির জন্য কিছু করার তাগিদে ঘরে ফেরেন। রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি তার কখনোই ছিল না। কিন্তু জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে শত শত শিক্ষার্থীর কাছে হয়ে আছেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র।

কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি ছাত্র পড়ানোর জন্য, জ্ঞান বিতরণের জন্য। রাজনীতিই যদি করতাম তাহলে গবেষণা কেন করছি? শিক্ষার্থীদের হাতে মশাল জ্বালিয়ে দেওয়া আমার কাজ। বাকি পথটা তারাই দেখে নেবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতে কি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া লাগে? তিনি আমাদের সবার নেতা। অধ্যাপক বসাকের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তার ক্ষোভ আছে কিনা জানতে চেয়েছিলাম। উত্তরে বলেছিলেন, ক্ষোভ কেন থাকবে? আমি তো আর পুরস্কারের নেশায় গবেষণা ও শিক্ষকতা করিনি। যেচে কারও কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। যদি রাষ্ট্র কোনোদিন আমার কাজের প্রয়োজনীয়তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, সেটাই আমার মহাপ্রাপ্তি। এই কথা শোনার পর আমি তাকে আর কিছু বলার সাহস পাইনি।

নিউক্লিয়ার ফিজিপে দক্ষ এই একাডেমিশিয়ানের জন্ম পাবনা জেলার রাধানগর গ্রামে ১৯৪১ সালের ১৭ অক্টোবর। এই গ্রামেই অনেকটা অভাবের সংসারে তার বেড়ে ওঠা। ১৯৫৭ সালে রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক পাস করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে রাজশাহী কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে যোগ দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে তার ডাক আসে ১৯৬৫ সালে। বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনার জন্য প্রস্তুতি নিলেও স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সরকার তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে। তিনি হাল ছাড়েননি।

১৯৭২ সালের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ব্রিটেনের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ফিজিপে গবেষণা করার সুযোগ পান। নিউক্লিয়ার ফিজিপের সঙ্গে তখন থেকে তার সম্পর্ক। ১৯৭৫ সালে সেখান থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। দেশে ফিরেই তিনি কম্পিউটার ব্যবহারে জোর দিলেন। গবেষণার জন্য এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য ১৯৮৫ সালে তিনি সর্বপ্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপনে প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি কম্পিউটার ব্যবহার শুরু করেন। পরের বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। নব্বইয়ের দিকে শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি থাকাকালীন সেখানেও কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের দেওয়া ৩৭ হাজার মার্কিন ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেন।

পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগানোর বিভিন্ন কৌশল উদ্ভাবনে এগিয়ে রয়েছে তার গবেষণা টিম। আশি বছরেও তার গবেষণার উদ্ভাবন শক্তি আমাদের প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে এক গবেষণাপত্র জার্নাল অব ফিজিপে প্রকাশ করেছে তার দল। তুলে এনেছেন নিউক্লিয়ার শক্তি বিচ্ছুরণের মতো জটিল বিষয়। তার আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের ভেতর দেড় শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার গবেষণা প্রবন্ধ ইতোমধ্যে ১ হাজার ২শটি সায়েন্টিফিক আর্টিকেল উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করেছে। গবেষণার বাইরেও তিনি বিজ্ঞান, গবেষণা ও শিক্ষকতার মতো মৌলিক বিষয় নিয়ে পত্র-পত্রিকায় নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান সবার মাঝে ভাগ করে যাচ্ছেন।

গুণী এই অধ্যাপকের লেখা বই দেশের স্নাতক পর্যায়ে পড়ানো হয়। ২০০৮ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অবসর নেন। ২০০৯ সালে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে সম্মাননা পান। তার অধীনে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন পিএইচডিও করেছেন। শিক্ষা ও গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় ২০০৭ সালে পেনিনসুলা ওয়ালফেয়ার ট্রাস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বসাক বৃত্তি’ নামে একটি প্রকল্প চালু করে, যা প্রতি বছর মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হচ্ছে।

আমরা জানি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী জামাল নজরুলকে এই রাষ্ট্র সঠিক সময়ে মূল্যায়ন করতে পারেনি। তাত্ত্বিক এই পদার্থবিজ্ঞানীকে জীবনের শেষ সময়ে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়া হলেও তার কাজের ব্যাপকতা যেমন আমরা অনেকেই এখনও বুঝতে সক্ষম হইনি, তেমনি আরও এক পদার্থবিজ্ঞানীকে আমরা কাছে পাওয়ার পরও সঠিক সময়ে মূল্যায়ন করতে পারছি না। সরকার চাইলে তাকে গবেষণায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দিতে পারে। আগামী ১৭ অক্টোবর এই অধ্যাপকের আশি বছর পূর্ণ হবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মান হয়তো অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের স্মরণীয় স্মৃতি হিসেবে থাকবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কিছুটা হলেও ভারমুক্ত হবে। আশা করব, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে। অধ্যাপক বসাকের শিক্ষা ও গবেষণার মূল্যায়ন করবে।

লেখক: ড. নাদিম মাহমুদ,গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

আপনার মতামত লিখুন :