এই ভঙ্গুর রাষ্ট্রের দায় একদিন না একদিন তোমাদের ডানাও ভেঙ্গে দিবে

বি.ডি. রায়হান
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:১০ AM, ০২ জুন ২০২১

  • পরিকল্পনামন্ত্রীর মোবাইল চুরিতে সবাই হাস্যরসের ঘটনাটি দেখলেও, একবার ভেবে দেখেছেন কি? আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকা ‌কতটা ভঙ্গুর ও দুর্বল। অপরাধের মাত্রা এতই প্রখর যে, মন্ত্রীর মোবাইল চুরি করতেও হাত কাঁপছে না।

এক ধরণের মারাত্মক ড্রাগ নিয়ে ধরা খেয়েও অপরাধীরা হাসতেছে। গ্রেফতারের সাথে সাথে প্রতিটা মানুষই বলতেছে, অপরাধীরা টাকাওয়ালার ছেলে, কিছুদিন বাদে ছাড়া পেয়ে যাবে।একটা রাষ্ট্র চূড়ান্ত পর্যায়ে অধঃপতন হইলে জনগণের মাঝে আইনের অধিকার ও সুশাসন নিয়ে বিশ্বাস ভেঙ্গে যায়।

সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ২-৩ গুণ ভাড়া গুণতে হয়, বাইক আটকালে পুলিশকে ঘুষ দিতে হয়, আবার গাড়ির কাগজ করতে গেলে বিআরটিএর থাকা মাসুদদের টাকা দিতে হয়, পাসপোর্ট অফিসে দালাল ধরতে বাধ্য করায় নয়তো হয়রানি করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে টাকা ছাড়া কোন ফাইল পাশ হয় না, মাসের পর মাস ঘুরায়। সরকারী আমলাদের দুর্নীতির নিউজ করলে রোজিনারা জেলে যায়, এক পেট মোটা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কার্টুন আঁকলে কিশোরদের জেলে যেতে হয়, লিখালিখি করলে মুশতাকদের মরে যেতে হয়। বিরোধী মতের হলেই নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও জেল খাটতে হয়।

নিজ দেশের পাহাড়ে স্বাধীনভাবে ট্রাভেল করা যায় না, দেশের প্রতিটা আনাচে-কানাচে সিন্ডিকেট আর দালাল। চাঁন্দের গাড়ির সিন্ডিকেট, বোট সিন্ডিকেট, কটেজ সিন্ডিকেট, গাইড সিন্ডিকেট। ট্রাভেলিং সহ সব সেক্টরে শুধু টাকার খেলা।
এইদিকে, করোনা আসলে মহামারী কিন্তু রোগের জন্যে নয়, ব্যবসার জন্যে। দেশের করোনা হইছে দরবেশ বাবাদের ভ্যাক্সিন ব্যবসা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির ব্যবসা।

ঢাকা শহরে মোবাইল চোরদের বিশাল সিন্ডিকেট, একজন থাবা দিয়ে আরেকজনের হাতে পাস করে দেয় মুহূর্তের মধ্যেই। গলার চেইন টান মারে, কানের দুল টান মেরে কান ছিড়ে ফেলে, ব্যাগের মূল্যবান জিনিস হারাতে হয়। হাইওয়ে রোডে ডাকাতি হয়। রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে কুপিয়ে মেরে ফেলে কোন ভয়ভীতি ছাড়া। ঘরের ভেতর আগুনে পুড়ে মরতে হয়, ঘরের বাইরে এক্সিডেন্ট করে মরতে হয়। আধমরা হয়ে হাসপাতালেও দালাল সিন্ডিকেট ছাড়া বেড পাবেন না, লিংক আপ না থাকলে সু-চিকিৎসা পাবেন না, আইসিইউ পাবেন না। এমনকি মরে যেয়েও শান্তি নাই, মরা লাশ নিয়েও এই দেশে ব্যবসা হয়!
দেশে যেনো অপরাধের মহা উৎসব। কারো মনে আইনের ভয় নেই, সবাই জানে কিছু টাকা হলে, পলিটিকাল পাওয়ার থাকলে এই আইন হাতের মুঠোয় বন্দী।

মেয়েদের নির্জনে পেলেই ধর্ষণ হতে হয়, সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্টের শিকার হতে হয়। অপরাধীরা রাঘববোয়াল হলে ইস্যু প্যাঁচিয়ে খালাস দেওয়া হয়, চুনোপুঁটি হলে দু-একটা কারাদন্ড দিয়ে বুঝানো হয় দেশে আইনের সুশাসন এখনো আছে। মাফিয়া সিন্ডিকেটের শক্তি এতই বেশি যে, সরাসরি বিচারককে ঘুষ দিয়ে রায় বদলানো যায়। দু-একটা রায়ে কোন পলিটিক্যাল এজেন্ডা না থাকলে সঠিক রায় দেওয়া হয়।

একটা পরিবেশ মন্ত্রণালয় পইরা আছে, অথচ দেশে প্লাস্টিক পলিউশন, কল-কারখানার দূষণ, ট্যানারি দূষণ নিয়ে কোন কাজ নাই। এসি রুমে বসে ক্লাইমেট নিয়ে কাজ করা যায় না। প্রচন্ড গরমে সাধারণ মানুষ হাঁসফাঁস করে। আবার বৃষ্টি আসলেও জলাবদ্ধতায় শহর ডুবে যায়। ‌দুুুইটা সিটি কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকা খরচ করতেছে কিন্তু জলাবদ্ধতা আর যাইতেছে না। 

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পুরো দেশ উদোম রেখে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গুলো বন্ধ করে দেশের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

খাদ্য সহায়তা দিলে গরিবের ঘর পর্যন্ত পৌছানোর আগেই শেষ, রাস্তাঘাটে নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে, প্রতি বছর রাস্তা ঠিক করতে বাজেট আনে। প্রধানমন্ত্রী গৃহায়ণ প্রজেক্টের ঘরবাড়ি ২ মাস না যেতেই ভেঙ্গে পরে। পলিটিক্যাল টেন্ডারবাজির মাধ্যমে কন্ট্রাক্টে কাজ পাইয়ে দিয়ে প্রতিটা সেক্টরে দুর্নীতির সহিত কাজ হয়। খাদ্যে ভেজাল, পাউডার দুধে মেলামাইন, অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে কিডনিজনিত ও হার্টের রোগে ভুগে সাধারণ জনগণ।

দেশে সুচিকিৎসার অভাব, খাদ্য নিয়ে দুর্নীতি ও ভেজাল, আইনের সুশাসন নেই, বাসস্থানের নিশ্চয়তা নেই, জীবনের নিরাপত্তা নাই। একটা রাষ্ট্র যখন দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পুরোপুরি ভাবে ব্যর্থ হয়ে যায় তখন সেটি আর জনগণের রাষ্ট্র থাকে না, মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই দেশে বেঁচে থাকতে হলে, ফ্যামিলিতে একজন ডাক্তার, একজন পুলিশ ও একজন পলিটিক্যাল ব্যক্তি থাকা চাই। নয়তো প্রতিটা পদে পদে ভুগতে হয়। রাষ্ট্রের সাধারণ আমলারাও যখন পাওয়ার প্রাক্টিস করে তখন সেই পাওয়ার গেইন করতে একটা বৃহৎ অংশ বিসিএসের দিকে ঝুকে পরে, অটোমেটেড প্রসেস। আল্টিমেটলি, জ্ঞানশূণ্য জাতির জন্ম হতে থাকে।

তাদের জন্ম হওয়ার পর শুধু মেট্রোরেল, পদ্মাসেতু, স্যাটেলাইট, এক্সপ্রেসওয়ে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জিডিপি বৃদ্ধি দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নতি হচ্ছে, এমন বুলি কপচাতে থাকে। একটা দেশের বাজেট বৃদ্ধি পাইলে সেই দেশের কাঠামোগত উন্নয়ন হবে এটা ন্যাচারাল। কিন্তু রাষ্ট্রের সুশাসনের উন্নতি না হলে, জণগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারলে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আর বিবেচ্য থাকে না। দেশের অধিকাংশ মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে, ভাসমান ভাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এর দিকে দৌড়াচ্ছে…।

যে ক’টা পাখির প্রতিবাদী ডানা ভেঙ্গে দিয়ে ভেবেছিলে রাষ্ট্রের ডানা ভাঙ্গে নাই, তোমরা ভুলে যেও না, এই ভঙ্গুর রাষ্ট্রের দায় একদিন না একদিন তোমাদের ডানাও ভেঙ্গে দিবে…..।

লেখক: বি.ডি. রায়হান
সোশ্যাল এক্টিভিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :