চার বছরে নতুন এক সাম্রাজ্যের জন্ম দিয়েছেন যবিপ্রবি উপাচার্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:২৭ PM, ১৮ এপ্রিল ২০২১

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) বর্তমান উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন ২০১৭ সালের ২০ মে যোগ দেন। আগামী ১৯ মে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কিন্তু তিনি যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির অভিযোগ চার বছরে নতুন এক সাম্রাজ্যের জন্ম দিয়েছেন এই উপাচার্য। তবে শিক্ষক সমিতির আনীত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেছেন উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন।

যবিপ্রবি‘র শিক্ষক সমিতির একাধিক নেতা উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি বিকৃতি, অস্তিত্বহীন কর্মচারীর নামে বেতন উত্তোলন, নিয়ম বহির্ভূতভাবে গবেষণা ভাতা নেয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি দেওয়া ও এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে স্থানান্তর, শিক্ষকদের শ্রান্তি বিনোদন ছুটি ও ভাতা প্রদানে স্বেচ্ছাচারিতা, ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল রিজেন্ট বোর্ডে অনুমোদিত ২৩/২৯ তম সিদ্ধান্ত অমান্য করে শিক্ষকদের বঞ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিভিন্ন ধারা অমান্য করে বিভিন্ন বিভাগের প্লানিং কমিটি গঠন, বিভিন্ন ভবনের মনগড়া ব্যবহার, আপন বোন ও দুঃসম্পর্কের শ্যালিকার নাম দিয়ে বেনামে উপাচার্যের নিজেই ঠিকাদার বনে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটিয়েছেন।

যবিপ্রবি‘র শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী কমিটির ১১ জনের মধ্যে ১০ জন গত ১৫ মার্চ এসব বিষয় উল্লেখ করে একটি অভিযোগপত্র প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যান বরাবর জমা দেন।

জানতে চাইলে শিক্ষক সমিতির কার্য নির্বাহী কমিটির একাধিক নেতা বলেন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের সীমাহীন দুর্নীতি ও চরম স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

আবেদনের কপি বিশ্লেষণ করাসহ তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে কর্মচারী সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত একটি তালিকায় বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের বিভিন্ন পদে দৈনিক মজুরী ভিত্তিক কর্মরত কর্মচারীর সংখ্যা ৩২ জন। এর মধ্যে উপাচার্যের বাংলোতে অফিস সহায়ক পদে কামরুল জামান, সহকারী কুক পদে পারভীন এবং মালী পদে মো. মামুন হোসেন কর্মরত আছেন। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের দৈনিক মজুরীভিত্তিক কর্মচারীদের হাজিরা ও বেতন বিলের কপিতে রিজিয়া বেগম নামে একজন ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে বেতন উত্তোলন করা হয়। দৈনিক মজুরীভিত্তিক কর্মচারীদের তালিকা অনুযায়ী অন্য আরেকটি চিঠিতে দেখা যায় রিজিয়া বেগম নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কর্মরত নেই।

উপাচার্যের একান্ত সচিব (পিএস) মাসুম বিল্লাহ’র স্বাক্ষরে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের বেতন বাবদ রিজিয়া বেগম নামক ব্যক্তির বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারী উত্তোলন করা হয়েছে। তাহলে কে এই রিজিয়া বেগম আর কেন উপাচার্যের একান্ত সচিব এই অর্থ উত্তোলন করছেন? ঢাকায় উপাচার্যের পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জন্য বাড়ি ভাড়া বাবদ নিয়ম বহির্ভূতভাবে যবিপ্রবি থেকে প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকা নেন।

সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে উপাচার্য ক্যাম্পাসে অবস্থানকালীন দিনপ্রতি ১২৫ টাকা ভাড়া দিয়ে উপাচার্যের জন্য নির্ধারিত বাংলো সম্পূর্ণ ব্যবহার করেন এবং বাংলোর সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। কিন্তু যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানানুযায়ী ভাড়াটা সামঞ্জস্যপূর্ণ না বলে অভিমত দেন শিক্ষক সমিতির কার্য নির্বাহী কমিটির নেতারা। গত ২০১৪ সালের ৩০ জুন তারিখে উপাচার্যের বাংলোর কাজ শেষ হয়।
এ ব্যাপারে উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় থেকেই নির্ধারিত বাসা ভাড়া পেয়ে থাকি। আর উপচার্যের বাসভবন এখনও পর্যন্ত আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে, শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনির উপস্থিতিতে গত বছরের ১৪ নভেম্বর যবিপ্রবির ‘শেখ রাসেল জিমনেসিয়াম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যবিপ্রবি’র উচ্চমানের গবেষকদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের নামের সাথে যবিপ্রবির উপাচার্যের নামের মিল থাকায় নিজেকে সেরা গবেষক হিসাবে মিথ্যাচার করে শিক্ষক সমিতির নিকট থেকে সম্মাননা নেন। এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন এক বছর অপেক্ষা করলেই সঠিকটা বুঝতে পারবেন।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, উপাচার্যের তদারকি ব্যর্থতায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘শেখ রাসেল জিমনেসিয়াম’ ভবন উদ্বোধনের ২ মাসের মাথায় ফাটল দেখা দেয়। এছাড়া, তিনি উপাচার্য হিসেবে যবিপ্রবিতে যোগদানের পর থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে গবেষণা ভাতা হিসেবে মাসিক ৩ হাজার টাকা গ্রহণ করেন অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বসেরা গবেষকদের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক ড. ইমরান খান, ড. জাভেদ হোসেন খান ও ড. আমিনুল ইসলামসহ অন্যান্য সব শিক্ষকদেরকে মাসিক গবেষণা ভাতা হিসেবে মাত্র ১ হাজার ৫ শত টাকা দেওয়া হয়।

শিক্ষক সমিতির দাবি অনুযায়ী, উপাচার্যের নিয়োগ বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের দাবিকৃত ১৭ লাখ টাকা দিতে না পারায় মুনজুরুর রহমান নামে এক যুবকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) পদে চাকুরী হলেও যোগদান করতে পারেননি, যা যবিপ্রবি উপাচার্যের নিয়োগ বাণিজ্যের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অমান্য করে পিএইচডি ডিগ্রিবিহীন ৩৫ বছরের অধিক বয়সে ফিরোজ কবির নামের এক ব্যক্তিকে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে উপাচার্য কর্তৃক টিওএন্ডই এর অনুমোদনবিহীন ফিজিওথ্যারাপী এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ খোলা হয় এবং উক্ত বিভাগে কোনো প্রকার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগ বোর্ড ছাড়াই পুনরায় ফিরোজ কবিরকে একটি পত্রের মাধ্যমে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া, ফিরোজ কবিরের স্ত্রী শর্মিলা জাহান-কেও (বয়স: ৩৩ বছরের বেশি) ফিজিওথ্যারাপী এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অমান্য করে পিএইচডি ডিগ্রিবিহীন ৩০ বছরের অধিক বয়সে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, যবিপ্রবিতে মেডিকেল অফিসার নিয়োগে উপাচার্য চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির মাধ্যমে সিএসই বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গালিবের স্ত্রী ডা. নুসরত জাহান- কে নিয়োগের শর্ত অমান্য করে ৩৫ বছর ১১ মাস বয়সে নিয়োগ দেন যা যবিপ্রবিতে দুর্নীতির রেকর্ড ইতিহাস রচিত হয়েছে। শিক্ষক সমিতির অভিযোগ রয়েছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়কে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে উপাচার্য বেনামে নিজেই ঠিকাদারী করেন। বিনা টেন্ডারে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে নিজের আপন বোন রায়নুর জাহান শিউলি ও দুঃসম্পর্কের শ্যালিকা রেহনুমাকে দিয়ে টেন্ডার/ আরএফকিউ ব্যবসা করিয়ে রাজকীয়ভাবে অফিস ডেকোরেশন ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ভবনে এসি সরবরাহ ও স্থাপন করেন। এছাড়াও, উপাচার্য তার বাড়ির ব্যক্তিগত ড্রাইভার আরিফকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রাইভার পদে ও আরিফের বোন ফাতেমাকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে দাবি শিক্ষক সমিতির।

এ প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার বোনের কোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নেই। আর রেহনুমা বলে আমার কোনো শ্যালিকা কেন, কোনও আত্মীয়ও নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে একটা পক্ষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তারা মিথ্যা কুৎসা রটনা করছে।

অভিযোগ রয়েছে, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০১ এর তফসিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সংবিধি, ধারা ৩৭(২), (৮) অমান্য করে বিধিবহির্ভূতভাবে নিজের পছন্দের শিক্ষকদের দিয়ে বিভিন্ন বিভাগের প্লানিং কমিটি গঠন করে উপাচার্য পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ/পদোন্নতি দিয়ে তাদেরকে বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও ডিন নিয়োগ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিয়োগকৃত বিশেষজ্ঞ সদস্য ব্যতিরেকে নিজের পছন্দের সদস্যদেরকে দিয়ে বিভিন্ন নিয়োগ বোর্ড গঠন করেন। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাচারিতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে রিজেন্ট বোর্ডে অনুমোদিত নিয়োগ ও আপগ্রেডেশন নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এবং নিজের পছন্দের প্রার্থীদের অবৈধভাবে পদোন্নতি দিয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্য নিজে লিফট প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন কমিটির মনোনীত সদস্য হিসাবে লিফট প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন না গিয়ে অবৈধভাবে প্রভাব খাটিয়ে সেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে ভ্রমন ভাতা/ বিমান ভাড়া হিসাবে ঠিকাদারের নিকট থেকে টাকা গ্রহন করেন। শিক্ষক সমিতির দাবি অনুযায়ী, ডিপিপি তে উল্লেখিত ১ কোটি টাকা ব্যয়ে আনসারদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবনে তাদেরকে বসবাসের সুযোগ না দিয়ে উক্ত ভবনটিকে অবৈধভাবে যবিপ্রবির উপাচার্য নিজের দখলে রাখেন।

সূত্র: ভোরের কাগজ

আপনার মতামত লিখুন :