নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের দৈন্যদশার শেষ কোথায়

মুশফিকুর রহিম স্বপন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:৩৬ AM, ১৩ অগাস্ট ২০২১

 

‘চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়েছি ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে। যেখানে অনার্স শেষ হতে সময় লাগার কথা চার বছর সেখানে আমাদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা হয় ২০১৭ সালের একদম শেষে। আর ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের মার্চে। সেবছরের এপ্রিল থেকে মাস্টার্স শুরু করি, যেটা শুরু হওয়ার কথা ছিলো ২০১৬ তে। যা এখনো চলছে।’ কথাগুলো বলছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের এক শিক্ষার্থী।

এই ব্যাচটি ২০১৮ সালে মাস্টার্সে ভর্তি হয়। অনার্সে দূর্বিষহ সেশনজট কোনোরকমে পেরোলেও মাস্টার্সে ভর্তি হননি অনেকেই। ব্যাচটি অনার্স শুরু করেছিল ৪২ জনকে নিয়ে, এদের মধ্যে কেবল ১৮ জন ভর্তি হয়েছেন মাস্টার্সে। দুই বছরে চার সেমিস্টার মেয়াদি মাস্টার্সের তিনটি সেমিস্টারের পরীক্ষা ও রেজাল্ট হয়েছে। চতুর্থ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হলে আঘাত হানে করোনা। দেড় বছর কেটে যায়। কিন্তু সেই স্থগিত পরীক্ষা আর দেয়া হয়নি। সামনের ২০২২ সাল স্পর্শ করলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূরণ করবে তাদের এক দশক।

বিভাগটির অন্য শিক্ষাবর্ষেরও আছে এমন অভিজ্ঞতা। ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের কোনো ব্যাচই এখনো পুরোপুরি মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারেনি। ২০১৩-১৪ সেশনের মাত্র ৫/৭ জন মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন বলে জানা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তৃতীয় বছরে শুরু হওয়া এই বিভাগটিতে সেশনজট নামক আতঙ্ক বিরাজ করছে শুরু থেকেই। চারুকলা বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের প্রথম ব্যাচ থেকেই দীর্ঘ সেশনজট লেগে আছে। আমাদের ক্লাস, পরীক্ষা দুটিতেই একটু বেশি সময় লাগে, তিন দিন করে একটা ক্লাস কাউন্ট করে, পরীক্ষা শেষ করতেও প্রায় ২ মাস সময় লেগে যায়। সেই হিসেবে ৬ মাসের সেমিস্টারে ১০ মাস চলে যায় অনায়াসেই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ৮ বছর হয়ে গেল। আমরা কেবল অনার্স শেষ করলাম। এখনো মাস্টার্স শুরু হয়নি। আমাদের মাস্টার্স ২ বছর মেয়াদী। সেখানেও যদি দ্বিগুণ সময় লাগে তাহলে অনার্স মাস্টার্স শেষ করতে আমাদের যাবে এক যুগ সময়। এই বিভাগ আমাদের জীবন দূর্বিষহ করে তুলেছে। কোনোরকমে বের হলেই বাঁচি।’ এই সেশনেরও অনেকেই মাস্টার্স করবেন না সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পেছনে কারণ জানতে চাইলে সকরুণ সুরে শোনা যায়, ‘চারুকলা বিভাগ জীবন থেকে যা নিয়েছে তাই যথেষ্ট, আমার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন মিটে গেছে।’

শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষকদের নিজেদের পছন্দসই শিক্ষার্থীদের সুবিধা দিতে গিয়ে নানা সময় পুরো ব্যাচের পরীক্ষা পিছিয়ে দিয়েছেন। বিচ্ছিন্ন দুই একজনের ব্যক্তিগত সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে পরীক্ষা না নেয়া সেশনজট দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। সর্বোপরি শিক্ষকদের অবহেলায় আমাদের শিক্ষাজীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

এসব নিয়ে কোনো অভিযোগ কখনো করা হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে জানা যায়, ’বহুবার আমরা এসব নিয়ে কথা তুলেছি৷ কিন্তু জোর গলায় কিছু বলা যায় না। যারা একটু কথা বলে তাদের ইয়ার ড্রপ করে দেওয়া হয়। অনুরোধ করছি, আমাদের কারো নামই প্রকাশ করবেন না। শাস্তিভোগের মেয়াদ বাড়াতে চাই না।’

দীর্ঘ সেশনজট ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির নেপথ্যে কি জানতে বিভাগটির প্রধান ড. মুহাম্মদ এমদাদুর রাশেদ সুখনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বিভাগের তুলনায় চারুকলার পরীক্ষা আর ক্লাসের প্রক্রিয়াগুলি ভিন্ন। আর এটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ। একারণে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি কিভাবে এ সমস্যা দূর করা যায়।’ সেশনজটের বিরুদ্ধে কথা বললে ইয়ার ড্রপ দেয়া হয় এই অভিযোগকে অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। দুই একজন ড্রপ হলে তাদের নিজেদের একাডেমিক কারণে হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ড. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘চারুকলা বিভাগের সেশনজট আগে ছিল না। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে এটি সৃষ্টি হতে পারে। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে এই বিভাগের তিনটি স্ট্রীমকে বিভাগে পরিণত করে পূর্ণাঙ্গ অনুষদ করার কাজ চলছে। তবে করোনা পরিস্থিতির জন্য প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে না।’

উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘আগে সকলে মিলে করোনার ক্রান্তিকাল অতিক্রম করি। তারপর আবার নতুন করে শুরু করবো। আশা করি এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবো।’

আপনার মতামত লিখুন :