পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য এক দৃষ্টান্তের নাম শেখ হাসিনা

বিডি ক্যাম্পাস ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:২৫ PM, ২০ এপ্রিল ২০২১

শামস ই নোমান:

নিজেদেরকে সভ্যতার ঝান্ডাধারী দাবি করা মানুষেরই রয়েছে বেইমানি ও নৃশংসতার অসংখ্য কলঙ্কিত ইতিহাস। এরমধ্যে হত্যাকান্ডের মত বর্বরতা অন্যতম। রাজনৈতিক পৃথিবীতে রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ফিরিস্তিও ঢের।

পৃথিবীর বহুল আলোচিত রাজনীতিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ আবার জাতির জনকও ছিলেন। কেউ ছিলেন স্ট্যাটসম্যান।

সিনেট ভবনেই সিনেটরদের হাতে রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজার, থিয়েটার হলে আততায়ীর গুলিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, আততায়ী নাথুরামের হাতে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, উগ্রবাদী শ্বেতাঙ্গ যুবকের গুলিতে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অভিযানের ক্রোধে দেহরক্ষীর হাতে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, তামিল বিদ্রোহীদের আত্মঘাতী হামলায় রাজীব গান্ধী, আত্মঘাতী হামলায় বেনজির ভুট্টো সহ অজস্র রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ঘটনা পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে।

কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডই একমাত্র ঘটনা যেখানে কিনা একটা জাতির পিতাকে পরিবার ও আত্মীয় মিলিয়ে ২৬ জন সদস্য সমেত হত্যা করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর সব থেকে নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যা। ভাগ্যক্রমে সেদিন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন।
পরবর্তীতে পশ্চিম জার্মানি থেকে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা।

এত কিছুর পরও শেখ হাসিনা দমে যাননি। নীরবে চোখের জল ফেলেছেন, তবে পিতার শিখিয়ে যাওয়া আদর্শ ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেননি। পিতার অসমাপ্ত গল্পগুলোর সুন্দর সমাপ্তির জন্যই ফিরে আসলেন বাঙালির আশীর্বাদিক হয়ে। শত সহস্র প্রতিকূলতার বাঁধা ডিঙিয়ে স্বপ্ন ছুঁয়ে দিলেন আপন মহিমায়। লেখলেন এক নতুন সূর্যোদয়ের ইতিহাস। পিতা মুজিব আমৃত্যু পরিবারকে যেই মৃত্যুর স্বাদ দিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিক্ষণে, সেই মৃত্যুর স্বাদ শেখ হাসিনাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছুঁতে পেরেছিলো বলেই হয়তো আমরা আজও পৃথিবীর বুকে স্বাধীন সার্বভৌমত্বের স্বাদ আস্বাদন করতে পারছি। তারপরের ইতিহাস সহজতর ছিলো না। শেখ হাসিনা ধীরে-ধীরে হয়ে উঠলেন বিশ্বনেত্রী।

শেখ হাসিনা কীভাবে আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে উঠলেন সে প্রসঙ্গ উঠে আসে তার প্রয়াত স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়ার রচিত “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ” বইতে।
শেখ হাসিনা এবং ওয়াজেদ মিয়া যখন ভারতে অবস্থান করছিলেন, তখন ১৯৭৯ ও ১৯৮০ – এই দু’বছরে কয়েকজন সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা বিভিন্ন সময় দিল্লি যান তাদের খোঁজ-খবর নিতে। সেসময়ে শেখ হাসিনার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হয়ে উঠার পিছনে যে কজন আওয়ামী লীগ নেতার ভূমিকা ছিলো তা উঠে এসেছে প্রয়াত বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিয়ার লেখায়।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক, জিল্লুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বেগম আইভি রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, জোহরা তাজউদ্দীন, যুবলীগ নেতা আমির হোসেন আমু, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও তাঁর স্বামী গোলাম আকবর চৌধুরী, আব্দুল মালেক উকিল, ডক্টর কামাল হোসেন, এম কোরবান আলী, আব্দুল মান্নান, তোফায়েল আহমেদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন সময় দিল্লি গিয়ে শেখ হাসিনার সাথে দফায় দফায় আলোচনা করে, ১৯৮১ সালের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৩-১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। মার্চে একাধিকবার আসার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে ১৭ মে শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকা আসেন। সাথে মৃত্যুহীন প্রাণ নিয়ে কোটি বাঙালির প্রাণের সঞ্চার করতে।
তাঁর কণ্টকাকীর্ণ পথচলার শুরু আরও একবার।

শেখ হাসিনাই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র মানব যে কিনা পরিবারের সকলকে একরাতের মধ্যে হারিয়ে আবার সে পথ ধরেছিলেন বীরদর্পে। তৎকালীন স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাধীন বাংলাদেশকে নতুন মাত্রায় উঁচিয়ে ধরাই যার একমাত্র লক্ষ্য ছিলো।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ বার হত্যা চেষ্টার কথা জানা গেছে। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনায় মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬০ জন দলীয় নেতাকর্মী নিহত হওয়ার হিসাব আছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে দুটি, ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে চারটি, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারটি, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চারটি, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একটি এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে চারটি হত্যা চেষ্টার কথা জানা যায়।

তারমধ্যে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদিঘী ময়দানে হত্যাচেষ্টা, ১৯৮৯ সালের ১০ আগষ্ট ফ্রিডম পার্টির অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে হত্যা চেষ্টা, ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চতুর্থ জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনের সময় ধানমন্ডির গ্রিন রোডে ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে, ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ট্রেনমার্চ করার সময় পাবনার ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের বগি লক্ষ্য করে বেশ কিছু গুলি করে হত্যা চেষ্টা, ২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার শেখ লুৎফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশের আগে ২০ জুলাই ৭৬ কেজি ও একই সালের ২৩ জুলাই হেলিপ্যাডের কাছ থেকে ৪০ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে হত্যা চেষ্টা, ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা নির্বাচনি জনসভা করতে সিলেটে গেলে সেখানে বোমা পুঁতে রেখে হত্যা চেষ্টা, ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে গুলি করে হত্যা চেষ্টা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে গ্রেনেড হামলা অন্যতম।

১/১১ সময় দীর্ঘ ১১ মাস জেল খেটেছেন শেখ হাসিনা। বর্তমান আওয়ামী সরকারের ক্ষমতায় থাকাকালীনও বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক মহল বিভিন্নভাবে অর্থায়ন করেছে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য। কিন্তু শত্রুদের মুখে ছাই ছিটিয়ে দিয়ে প্রতিবারই শেখ হাসিনা পিতা মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মানের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন দুর্দান্ত গতিতে।
এতো বাঁধা বিপত্তি সত্ত্বেও শেখের বেটি দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন দিগ্বিদিক। তৃতীয় বিশ্বের একটা জনবহুল দেশকে জনসম্পদে রুপান্তর করে উন্নয়নের রোল মডেল করে তুলেছেন বিশ্ববাসীর কাছে।

এজন্যই শেখ হাসিনা লড়াকু মানসিকতায় পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্তের নাম। “বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী লগ্নে, মহান স্রষ্টার কাছে করি নিবেদন- শেখ হাসিনা শতায়ু হোন।”

লেখক:শামস ই নোমান
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
সাবেক পরিবহন সম্পাদক,
ডাকসু।

আপনার মতামত লিখুন :