বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং পঁচাত্তর পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান

শামস ই নোমান
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:৩৩ PM, ১৪ এপ্রিল ২০২১

জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই একটি বড় সংকট সঙ্গে নিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা ছাড়াও সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিপরীতমুখী বিন্যাস। পাকিস্তান রাষ্ট্র বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তার সমাধান দিতে পারেনি। পাকিস্তান সৃষ্টিলগ্ন থেকেই, একটা সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,
“আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।”

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। এই রাজনৈতিক দলটির গোড়াপত্তন হয় ২৩ জুন ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের অধিকতর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য এর নাম ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়।

সৃষ্টিলগ্ন থেকে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের যে ঝাণ্ডা উড়িয়ে এসেছে এই দলটি, শত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়েও সেই ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে। দলটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির দেশে পরিণত করার চেষ্টাকে কেবল রুখেই দেয়নি, অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংবিধানকেও সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে।

একটা সাম্প্রদায়িক শক্তি ১৯৭০ এর নির্বাচনেও বঙ্গবন্ধু কে ভারতের দালাল এবং ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলো।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে পাকিস্তান বেতারে জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে ইসলামের চিরন্তন কল্যাণকামী রূপের প্রতি তিনি কতটুকু মোহিত, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তিনি বলেছেন,
“আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে। আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য, আমরা লেবাসসর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হজরত রাসুলে করিম (সা.)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগদ্বাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বারবার যারা অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে, আমাদের সংগ্রাম সেই মুনাফিকদের বিরুদ্ধে, যে দেশের ৯৫ শতাংশ মুসলমান, সে দেশে ইসলামবিরোধী আইন পাসের ভাবনা ভাবতে পারেন তাঁরাই—ইসলামকে যাঁরা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা শায়েস্তা করার জন্য।”
১৯৭২ সালে সংবিধান যখন রচিত হয়, সেই সংবিধানের যে চারটি মৌলিক স্তম্ভ ছিল, তার একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু যেখানেই যেতেন, তিনি এটির অর্থ যে ধর্মহীনতা নয়, তা বারবার উল্লেখ করতেন। তিনি বলতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র পৃথক থাকবে। তিনি একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন চিরকাল।
ভয়াল পনেরো আগস্ট। শত সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু কে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈর বীর্যের অন্যতম পথিকৃৎ মেজর জিয়া, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জামায়াতকে ফিরিয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামীর ‘পুনর্জন্ম’ না হলে বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতি এভাবে বিকশিত হতো না৷ স্বাধীন দেশে ধর্মের অপরাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল৷ যুদ্ধাপরাধে ব্যাপকভাবে জড়িত জামায়াতে ইসলামীও তখন নিষিদ্ধ ছিল৷
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু এবং নারী-শিশুসহ তার পরিবারের প্রায় সবাইকে হত্যা করার পর ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অনেক কিছুই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোশকতায় ফিরিয়ে আনা হয়৷ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞাটা তুলে নেয়া হয়৷ পাকিস্তানে লুকিয়ে থাকা জামায়াত নেতারা একে একে ফিরেও আসে পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্টের পরে৷
দলের নামে ‘ইসলাম’ শব্দটা থাকলে অনেক মানুষের মনে জায়গা করে নেয়া, মানুষকে ধোঁকা দেয়াটাও সহজ৷ সরল, ধর্মপ্রাণ মানুষদের কেউ কেউ ভেবে নিতে পারেন ‘‘দলটির নামের সঙ্গে ‘ইসলাম’ আছে, মুখেও তারা ইসলামের কথা বলছে, সুতরাং তারা নিশ্চয়ই ইসলামের রক্ষক৷”

অথচ দলের নামে ‘ইসলামী’ শব্দটি থাকলেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী কী কী অপকর্ম করেছিল তা তো সবাই জানেন৷ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবার আর ধর্ষিতা নারীর স্মৃতিতে সেসব আছে, ইতিহাসের পাতায়ও তা লেখা আছে৷

টসটসে পাকা আম খুব ভালো৷ ফরমালিনযুক্ত হলে সেই আমই কিন্তু ভয়ঙ্কর৷ জামায়াত ফেরার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিও সেই নিয়মে ‘ফরমালিনযুক্ত’ হয়েছে৷
জামায়াতকে ফিরিয়ে বিএনপি রাজনীতিতে ‘ফরমালিন’ মেশালেও রাজনীতিকে ‘ফরমালিনমুক্ত’ করার উদ্যোগ নেয়নি পরবর্তীতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা এরশাদও।
বরং আরো নতুন নতুন উপায়ে ‘ফরমালিন’ মিশিয়ে সর্বস্তরের জনগণের মাঝে উগ্রতা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টাই লাগাতার করেছে। সংবিধানে পরিবর্তন এসেছে৷ সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ধর্ম নিয়ে রাজনীতির খেলায় সবচেয়ে মোক্ষম চালটা চেলেছিলেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে৷ এরশাদের পতনের ৩১ বছর পর সংবিধান এবং সম্ভবত জনমনেও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আরো জেঁকে বসেছে।

জামায়াতকে সর্বোচ্চ ওপরে তুলেছে বিএনপি।
স্বাধীনতার পরে যে দলটি নিষিদ্ধ ছিল বিএনপির বিশেষ কৃপায় সেই জামায়াত এক সময় জাতীয় সংসদেও ঢুকে পড়ে৷ ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত তো বিএনপির সহযোগী শক্তি হিসেবে মন্ত্রী পরিষদেও ঢোকে৷ আলবদর নেতা, যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী তখনই কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী হন৷

পরবর্তী সময়গুলোতেও এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ক্ষণেক্ষণে আস্ফালন করেছে। এখনও প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা কে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করে যাচ্ছে বিভিন্ন লেবাসধারী জামাতি সাম্প্রদায়িক প্রেতাত্মারা।
পঁচাত্তর পরবর্তী থেকে এখন অবধি এই জামাতি সাম্প্রদায়িক শক্তির মূল পৃষ্ঠপোষক, স্বৈর বীর্য থেকে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দল বিএনপি।
এখনই এদের বিষদাঁত উপরে ফেলতে হবে, নতুবা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশকে এরা বিতর্কিত করবে।

লেখক:
শামস ই নোমান
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
সাবেক পরিবহন সম্পাদক,
ডাকসু।

আপনার মতামত লিখুন :