রাজশাহীতে প্রথম কুকুর-বিড়ালের ক্লিনিক চালু করলেন প্রসেনজিৎ

উমর ফারুক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:৫৯ AM, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২১

সময়টা ২০২০ এর মার্চ! যখন বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণ আতঙ্কে সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করা হলে ১৮ মার্চ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বন্ধ হয়ে যায়। লকডাওন ও আতঙ্কে সবাই যখন ঘরে আবদ্ধ । ঠিক সে মুহূর্তে জনশূন্য ক্যাম্পাসে কুকুরগুলো ক্ষুধার তাড়নায় কাঁতরাচ্ছিল। ঠিক সেসময়ই বন্ধু হয়ে আর্বিভাব তার! প্রায় ১বছরে দু-শতাধিক কুকুর-বিড়ালের খাদ্য যোগান দিয়েছেন। শুরুটা নিজের অর্থায়নে পরবর্তীতে অনেকে তার সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসেই থেকেছেন সর্বক্ষণ। রেখেছেন খেয়াল, করিয়েছেন বিড়াল-কুকুরদের চিকিৎসাও। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা প্রসেনজিৎ এর কথা।

সম্প্রতি তিনি কুকুর- বিড়ালের চিকিৎসা সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাজশাহীতে প্রথমবারের মত প্রতিষ্ঠা করেছেন “কিটিক্যাট কেয়ার এন্ড কিউর” নামে একটি নিরাময় কেন্দ্র। যার উদ্বোধন করা হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। যেটা নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছিলো প্রসেনজিৎ এর সাথে।

প্রশ্ন : ক্যাম্পাসে বিড়াল-কুকুরদের নিয়ে কাজ কবে থেকে শুরু করেছিলেন?

প্রসেনজিৎ : করোনা সংক্রমণের কারণে ক্যাম্পাস যখন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। লকডাওনে সবাই যখন ঘরে আবদ্ধ ঠিক তখন থেকে ক্যাম্পাসে থাকা কুকুর-বিড়ালগুলো ক্ষিধের যন্ত্রনায় কাতর; তখন মনে হলো এদের জন্য কিছু করা উচিত। আমরা ক্যাম্পাসে কুকুর-বিড়ালকে খাওয়েছি। সাধ্যমতো চিকিৎসাও দিয়েছি। এক বর্ষ, গরম, শীত আমরা লকডাউনে ক্যাম্পাসের কুকুর-বিড়ালের সাথেই কাটিয়েছি৷

প্রশ্ন: কিটিক্যাট কেয়ার সেন্টার তৈরি করার তাড়না কবে থেকে?

প্রসেনজিৎ :দেখুন,স্বপ্ন বলে কিছু নেই, যা অাছে তা অভাব। অভাব পূরণ হয়, স্বপ্ন কল্পনা মাত্র।সুনসান ক্যাম্পাসে সাথে কুকুর-বিড়ালের সাথে কাটিয়েছি। এই অভাবটা তাড়না করছেপ্রিয় কুকুরদের সাথে প্রসেনজিৎ

গত বছর জুনের দিকে। বুল্ডুর কথাই বলি। ওর মুখে কেউ মেরেছিলো। ওর তখন মাস খানিক বয়স। মুখের ডানপাশে চোখের নিচ থেকে সব খসে পড়েছিলো। চোয়ালের হাড়টা নেই। তিন মাস লেগেছিলো সুস্থ করতে। বঙ্গবন্ধু হলের বিড়ালটা কোলের উপর ই মৃত্যু হলো! শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সামনের কুকুরটা রাস্তায় গাড়ির তলে পড়ে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে-ধুঁকে মরলো!এগুলো দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। তখন থেকেই তাড়নাটার শুরু৷

প্রশ্ন: হঠাৎ এরকম একটা ভিন্ন চিন্তা আসলো?

প্রসেনজিৎ: জানুয়ারির তিন তারিখ ক্যাম্পাস ছাড়ি৷ ক্যাম্পাসের কুকুর গুলোর জন্যে মন খারাপ হচ্ছিল। অভাব পূরণ করতে গেলে মায়া ছাড়তে হবে। আসলে দেখলাম কুকুর-বিড়ালের চিকিৎসার অবস্থা খারাপ। এত বড় একটা শহরে যেন অনেকটা নেই। মাস-চারেক আগে এটা মাথায় চেপে বসে৷ মনে হলো এদের নিয়েই কিছু করা উচিত।

প্রশ্ন : কিটিক্যাট কেয়ার সেন্টার ও শপটি কোথায় করলেন?
প্রসেনজিৎ : এসব নিয়ে কাজ করলে বাসা পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। পুরো ডিসেম্বর মাস চলে যায় বাসা খুৃঁজতে-খুঁজতে। কুকুর-বিড়াল নিয়ে কাজ করবো বলে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায়নি ৷ মাস খানিক পর বাসা পাই ৷ রাজশাহী নগরীর বহরামপুর মোড়ে এ কিটিক্যাট কেয়ার সেন্টার ও শপটা চালু করি।

প্রশ্ন : শপটি উদ্বোধন কবে করলেন?

প্রসেনজিৎ : ৩ জানুয়ারি ক্যাম্পাস ছাড়ি। অাজ একমাস দশদিন পর আমার নতুন প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করতে পারি। কিটিক্যাট( কেয়ার এন্ড কিউর) প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন আওয়ামীলীগের বন ও পরিবেশ উপ-কমিটির সদস্য ডা. আনিকা ফারিহা জামান অর্ণা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের লেকচারার রিজভী আহমেদ ভুঁইয়াসহ আরো অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

প্রশ্নঃ কি ধরনের সেবা দিবেন?
প্রসেনজিৎ : সবার সাপোর্ট পেলে চব্বিশ ঘন্টা অত্যাধুনিক ক্লিনিক সার্ভিস দেবো। ফোস্টার কেয়ার থাকবে। সেখানে চাইলেই যে কেউ সার্ভিস চার্জ দিয়ে বিড়াল রাখতে পারবে। বিভিন্ন ধরনের ক্যাটফুড, ডগফুড,খেলনা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকছে। উন্নত দেশে পেট সংক্রান্ত যেসব সুবিধা আছে ধীরে-ধীরে সেসব সুবিধা দেয়া হবে। পথকুকুর বিড়ালের জন্য একটা শেল্টার হোম করা হবে যেখানে ফ্রি চিকিৎসা দেয়া হবে। একটু সময় লাগবে। অবশ্যই সবার সমর্থন প্রয়োজন।

প্রশ্ন: কতটুকু সহযোগিতা পেয়েছেন?

প্রসেনজিৎ : আর্থিক সাপোর্ট বলতে এখানেও একটা রিস্ক থেকে যায়। প্রথম একজন ঐসময়ই সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দেন৷ উনিই সর্বপ্রথম আমাকে ব্যাংকে যেতে বলেন।অামি এখানকার একটা ব্যাংকের ম্যানেজার মহোদয়ের সাথে এটা নিয়ে কথা বলি৷ ব্যাংক থেকে নানান শর্ত। অনেকটা মন খারাপ করে ঘরে ফিরি। এসময় এই ভুত আরো বেশি ঘাড়ে চাপলো। ব্যাংক যত শর্ত দেয়। ততই আমার জেদ চাপে! মাস দুয়েক ঘুরে কোন সমাধান পাইনি৷ এদিকে  নিজের যা টাকা আছে তা দিয়ে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে চালানোও সম্ভব না। তখন ফোস্টার কেয়ার, পেট শপ, পেট ক্লিনিকের ভুতটা আরো বেশি চাপলো। এগুলো মাথা ভার করে তুলছিলো৷ ততদিনে চাকরির পড়াশুনাও ছেড়ে দিয়েছি। অনেক ঘুরলাম কিন্তু নতুন প্রজেক্টের কোন সূত্র পেলাম না৷ হঠাৎ একদিন অামার বিভাগের বড় আপাকে জানালাম। ঐদিন রাতেই উনি একজনের নাম্বার দিলেন। পরদিন সন্ধ্যায় কাজলায় ডি-লাউঞ্জে প্রথম আলাপ হলো। প্রথম দিনেই আমার চিন্তায় তারা কাজ করতে রাজী হলেন। মাস তিনেক একলাই যেতাম হতাশ হয়ে হঠাৎ যেন অভাবটা সামনে আসতেই পূরণ হতে চলেছে৷

প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
প্রসেনজিৎ: গতমাসের ১৭ তারিখের পর মুল ডেকোরেশনের কাজ শেষ করে অবশেষে অামার অভাব অনেকটা পূরণ হয়েছে।”কিটিক্যাট কেয়ার” আমার অভাব ছিলো। এখন অনেকটা পূরণ হলো। অামি চাই একটা সময় কিটিক্যাটের নিজস্ব পেট এম্বুলেন্স থাকবে, পেট অাইসিইউ এম্বুলেন্স থাকবে। এখন ডগফুড,ক্যাটফুড, টয়,ফোস্টার কেয়ার সামগ্রী থাকছে৷

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন তরুণ উদোক্তাদের পাশে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত?

প্রসেনজিৎ : নতুন চিন্তা। নতুন ব্যবসা সবকিছু মিলিয়ে আর্থিক সাপোর্ট পাচ্ছি। কিন্তু একটা উন্নত এবং অাধুনিক হাসপাতাল করতে হলে অনেক অর্থ প্রয়োজন।সেক্ষেত্রে যদি যুব মন্ত্রণালয় কিনবা বাংলাদেশ সরকার যদি আমার প্রতিষ্ঠানকে বিনা সুদে ঋণ দেয় তবে আমার সবগুলো পরিকল্পনা কয়েকমাসে সম্পূর্ণ করা সম্ভব। নয়ত আমাদের একটু হয়ত দেরি হবে। সরকারের এদিকটায় নজর দেয়া উচিত। আমি সরকারের কাছে একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে সুযোগ চাই৷

আপনার মতামত লিখুন :