হেইট ক্রাইম থামান এখনই

বিডি ক্যাম্পাস ডেস্ক
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:২৯ PM, ২৩ মে ২০২১

অভিজিৎ সরকার:

সময় বদলে যায় সময়ে সাথে সাথে বদলে যায় অপরাধের ধরন,গতি প্রকৃতি। কালের বিবর্তনে কোন একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় এক সময়ের ক্ষুদ্র অপরাধ অন্য একটি ভৌগোলিক সীমা রেখায় হয়ে উঠে বৃহৎ অপরাধ।এই ভাবে নতুন রুপে নতুন ভাবে অপরাধ বিস্তার লাভ করে। তেমনি একটি অপরাধ হল হেইট্ ক্রাইম (Hate Crime)।উন্নত বিশ্বের দেশ আমেরিকায় ১৯৮০ সালে প্রথম হেইট্ ক্রাইমের প্রচলন শুরু হলেও ক্রমশই এর তীব্রতা ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বেজুড়ে।বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এই অপরাধ অনেকটাই নতুন।তাই এই অপরাধের ধরন,তীব্রতা ও অপরাধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধারণা না থাকার ফলে বাংলাদেশে হেইট্ ক্রাইম অনেকটাই উপেক্ষিত।অনেকে আবার হেইট্ ক্রাইম কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে নারাজ।

শাব্দিক অর্থে Hate Crime হলো ঘৃণা জনিত অপরাধ।ঘৃণা থেকে যে অপরাধ সংগঠিত হয় তাই ঘৃণা জনিত অপরাধ। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় ঘৃণা করা কি অপরাধ?-“না”, ঘৃণা করা কোন অপরাধ নয়। হেইট্(Hate) কোন অপরাধ নয় যতক্ষণ না পর্যন্ত এর সাথে ক্রাইম (Crime)যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ঘৃণা যতক্ষণ পর্যন্ত কোন নিদিষ্ট লিঙ্গের, ভাষার,সম্প্রদায়ের, জাতির, ধর্মের, মতাদর্শের মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় ততক্ষণ পর্যন্ত ঘৃণা অপরাধ নয়।যেমনঃকাউকে ঘৃণা করা অপরাধ নয়,ঘৃণার কারণে আক্রমণ করা অপরাধ, সেই ঘৃণা থেকে আক্রমণ করে হত্যা করা আরো বড় অপরাধ। হেইট্ ক্রাইমের বিষয়টি অনেকটা সেই রকমের অপরাধ বলা যেতে পারে ।
সহজ ভাবে বলতে গেলে, কোন ব্যক্তি বা গোষ্টি যদি ভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম,বর্ণ ও মতাদর্শের মানুষের প্রতি ঘৃণা ধারণ করে তাকে কোন ভাবে আক্রমণ বা আঘাত করে সেটাই হলো হেইট্ ক্রাইম।

হেইট্ ক্রাইমের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অপরাধ সম্পর্কে ভিক্টিম-অফেন্ডার উভয়ের পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্ঞান না থাকা।অফেন্ডার অনেক সময় মনের ক্ষোভ থেকে নিদারুণ আনন্দ পেতে এ অপরাধটি করে থাকে।অফেন্ডার মনে করে এটি কোন অপরাধ নয়।অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভিক্টিম শারীরিক ভাবে আক্রান্ত না হলে আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। বরং অপরাধে শিকার হয়ে হীনমন্যতায় ভোগতে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে নিজের উপর দোষ দিয়ে অপরাধটি চেপে যেতে দেখা যায়।ফলে হেইট্ ক্রাইম সমাজে মাইনর ক্রাইম হিসেবেই থেকে যায়।অপরাধী শাস্তির আওতায় আসে না বলেই ক্রমাগত অপরাধ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সচারাচর যে সব ঘৃণা জনিত অপরাধ সংগঠিত হয় তার মধ্যে রয়েছেঃ
 মৌখিক আক্রমণ। যেমনঃগালাগালি করা,অপমান করা,খাটো করে কথা বলা, কটু কথা বলা,বিদ্বেষপূর্ণ কথা বলা,ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাজে মন্তব্য করা।
 সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, ইউটিউব,ইনস্টাগ্রাম,টুইটার সহ অন্যকোন মাধ্যম ব্যবহার করে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ, আপত্তিকর, আক্রমনাত্মক কমেন্ট, ছবি, ভিডিও,কোন মন্তব্য খন্ডিত করে প্রচার করা,কুৎসা রটানো, টেক্সট, ফোন কল দেয়া।
 হুমকি,হয়রানি, ভয়-ভীতি, আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন।
 অগ্নি সংযোগ, সম্পত্তি নষ্ট করা,সম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট করা।
 যৌন নির্যাতন ও আক্রমণ করা
 ভিন্নমতের জন্য হত্যা করা
 গ্রাফিতি আঁকা,ব্যক্তির মর্যাদাহানি করে এমন চিত্র, ভিডিও, ডকুমেন্ট প্রকাশ করা ইত্যাদি।
ভিক্টিমের যদি মনে হয় এই সকল বিষয়ের কোন একটি কারণে তার উপর আক্রমণ হয়েছে তাহলে তা সেটি হেইট্ ক্রাইম বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ।

পরিচিতির দিক থেকে হেইট্ ক্রাইম পিছিয়ে থাকলে ও বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে এই ধরনের অপরাধ সংগঠিত হয়ে আসছে। যদি ও সেটি ব্লগার,লেখক, প্রকাশক,মানবাধিকার কর্মীদের হত্যার মধ্যদিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনায় আসে। যা পরবর্তী সময়ে অনেকটা কমে আসলে ও অপরাধের ধরন পাল্টে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র আকার ধারণ করে।যার থেকে বাদ যায়নি কবি ,সাহিত্যিক, সাংবাদিক,সাংস্কৃতিক কর্মী,শিক্ষক ,রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ক্রিকেটার কেউই। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হেইট্ ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন।বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক এখন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নোংরা, অশালীন , আক্রমনাত্মক মন্তব্যে সয়লাব। ।এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া, রোষানল শুধু দেশের মানুষ কে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নেই।বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কিংবা পাবলিক ফিগারদের ফেইসবুক কমেন্ট অফশন কে বিষিয়ে তুলছে।যদি ও বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতির পরিচয় মর্যাদাবোধ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমেন্ট কিংবা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার উপর শতভাগ নির্ভর করে না ঠিকই তবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে হেন কর্মকাণ্ড জাতি হিসেবে আমাদের সম্মানিত করে না বরং লজ্জিত-অপমানিত করে।এই প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এতোটাই প্রতিক্রিয়াশীল যে তাদের প্রতিক্রিয়া শুধু অশ্লীল, আপত্তিকর, নোংরা মন্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা কোন ব্যক্তি কিংবা জাতির দুঃখ,দুর্দশা, দুর্দিনে, শোকে ,মৃত্যুতে উল্লাস করে পৈশাচিকতার প্রমান দেয়। অথচ সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির অনন্য নিদর্শন নিজ নিজ ধর্মপালন করা, পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা,জাতি ,ধর্ম ভুলে একে অপরের বিপদে সহযোগিতা করা,অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া। হয়তো একজন মানুষের কোন একটি বিষয়ে প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা থাকতেই পারে, গঠনমূলক সমালোচনা করা অধিকার ও রয়েছে তবে হিংসা,বিদ্বেষ,অশ্লীলতা,নোংরামি, হুমকির মাধ্যমে অন্যের জনজীবন কে বিষিয়ে তোলার কোন অধিকার নেই।তেমনি ভাবে আইনের আশ্রয় নেয়ার অধিকার থাকলে ও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার অধিকার নেই। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহে গঠনমূলক আলোচনা সমালোচনা পরমতসহিষ্ণুতার আদর্শ একটি প্লাটফর্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এটি ঘৃণা বিদ্বেষ, সহিংসতা, আক্রমণ প্রতি আক্রমণের কোন মাধ্যম নয়।পরম শত্রু হলে ও কোন ব্যক্তি/জাতি/ধর্মের/ মতাদর্শের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, মৃত্যু কখনো উল্লাস উপহাসের বিষয় হয় না তেমনি ঘৃণা মাধ্যমে অপরাধ ছড়ানো কোন সুস্থ বিবেকবান জাতির ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে না।কারো মতামত,ধর্ম,সংস্কৃতির প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা থেকে যারা ঘৃণা ছড়িয়ে অপরাধ করে চলছে তাদের অপরাধ কে ২০ কোটি জনসংখ্যা দেশে কয়েক হাজার মানুষে মাইনর অপরাধ বলে সংখ্যায় পরিমাপ করলে অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকবে,অপরাধী অপরাধে উৎসাহিত হবে,পরোক্ষভাবে অপরাধ কে সমর্থন করা হবে।তাই হেইট্ ক্রাইম শিকার হলে প্রতিবাদ করুন, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।হেইট্ ক্রাইম থামান এখনই।

লেখকঃ অভিজিৎ সরকার, শিক্ষার্থী:অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :